Showing posts with label গল্প. Show all posts
Showing posts with label গল্প. Show all posts

Friday, September 7, 2018

মরুর বুকে শ্রাবণ বৃষ্টি



'এই নীলা, কোথায় যাচ্ছিস?'
'কোথায় আবার বাসায়?'

'চল না আমার সাথেতোকে লাঞ্চ করাবো।'
'হুট করেআগে তো বলিস নি?'
'হুট করেও হলো তাই।'
'মানে কি
'একজনের সাথে দেখা করতে যাবোফেসবুকে পরিচয়।' 
'না না ভাই, আমি যাবো নাতুই যাতোর এই পাগলামির সাথে আমি নাইআর কয়জনের কাছ থেকে এভাবে খাবিআমার এসাইনম্যান্ট বাকি আছে ওটা শেষ করতে হবে।'
'আরে করবিনেচল না আজই শেষ।'
'নাতুই মজা লুটআমি নাই। যতসব লুইচ্যাদের সাথেগেলেই ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকবে বুকের দিকে। এসব পুরুষদের দেখলেই আমার বমি আসেতুই যা আমি যাবো না।'

বলে নীলা রিক্সা ডেকে বাড়ির দিকে চলে গেলো। বাসায় ঢুকেই দেখতে পেল কে যেন এসেছে। সে তাকে এড়িয়ে চলে গেল তার রুমে। কিছুক্ষণ পর তার মা এসে বলল
'তুই গোসল করেতৈরী হয়ে নে।'


'কেন কি হয়েছেতৈরী হবো মানেসবে তো এলাম।'
'তোর বাবার বন্ধু এসেছেতোকে দেখতে চেয়েছে।'
'তো দেখলে তো এমনিই দেখতে পারেতৈরী হওয়া লাগবে কেন?'
'যা বলেছি তাই করতোর বাবা আমাকে পাঠিয়েছেযা তারাতারি।'


বিরক্তি নিয়ে গোসল করতে চলে যায় নীলাশাওয়ার ছাড়তেই তার মনে হলো তার বাবা একদিন তার মাকে বলছিল অরন্যের কথা। তার সাথে নাকি বিবাহ ঠিক করেছে নীলার। নীলার মনে ভয় কাজ করছেমনে মনে ভাবলোএই লোকটাই কি অরন্যের বাবাতার মনে হলো তার স্বপ্নগুলো বোধহয় আজই মাটিতে মিশে যাবে। কিছুক্ষণ স্থির থেকে সে মার কথা অনুযায়ী কাজ করতে লাগলো। সাজতে ভালো লাগে না তারশুধু কপালে ছোট্ট একটি টিপ আর লিপস্টিক দিয়ে আসলো তার বাবার বন্ধুর নিকট। উনি নীলাকে দেখেই বলে উঠলো মাশাল্লাহ্। তার বাবার দিকে তাকিয়ে তিনি বলতে লাগলো,
'দোস্ত তাহলে আজই তোর মেয়েকে ছেলের জন্য আংটি পরিয়ে যাই।'


'আর আমি তোকে জানিয়ে দিবোবিয়ের ডেট কবে'- বলে পাঞ্জাবির পকেট থেকে আংটির বাক্স থেকে আংটিটা বের নীলাকে বলল,
'দেখি মাহাতটি দেখি।'
নীলা তার মা'র দিকে তাকিয়ে তৎক্ষণিক তার বাবার দিকে তাকালোতার বাবা চোখ রাঙ্গাতেই সে চোখ নামিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল। উনি আংকটি পড়িয়ে দিলো নীলার হতে। নীলা কিছুক্ষণ বসে চলে গিয়ে লাফিয়ে পড়লো বালিশের উপর। ঘন কালো মেঘ জমাট বেঁধে বুক ফেঁটে আষাঢ়-শ্রাবণের ঢল বইতে লাগলে বালিশের উপর।



'অরণ্য খেতে আয়তোর বাবা বসে আছে।'
'জ্বি মাআসছি।'


বলে অরন্য খাবার টেবিলে আসলো। তার বাবা অরণ্য কে বলতে লাগলো,
'অরণ্যতোমার জন্য আমার বন্ধুর মেয়েকে আংটি পড়িয়ে আসছিমেয়েকে আমার খুব পছন্দ হয়েছেমেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্সে চতুর্থ বর্ষে পড়ছে। আশা করি তুমি দ্বিমত করবে না। আগামী মাসের ৭ তারিখ বিয়ের তারিখ ফেলতে চাই। তোমার অফিসিয়াল ব্যস্ততা নাইতো।'  
'আমি কি তোমার মতের উপর কখনো কিছু বলেছি। তুমি যা বলবে তাই হবে। আমি সব ম্যানেজ করে নিবোবলে অরণ্য উঠে গেল।

কিছুক্ষণ পর অরণ্যের বাবা নীলা বাবা ফোন করে বিয়ের ডেট পাকা করে ফেলল।

'এই নীলা তোর কি হয়েছেরে, এত চুপ কেন?'
'চল আজকে তোকে নিয়ে ঘুরবো, বলাকায় সিনেমা দেখবো, খাবোবলে আমার হাতটি ধরে টান দিল।
আমি বললাম, 'দাড়া যাবতো, অরুন স্যারের ক্লাস করবি না ?'
'না আজ করবো নাচল।'
'তাহলে চল, আমার সমস্যা নাই।'
ক্যাম্পাস থেকে রিক্সায় উঠলাম, রিক্সায় নীলা কে জিজ্ঞেস করলাম, 'কিরে তোর কি হয়েছে?'
'আজ আমার মন খারাপ, তাই।'
'তো মন খারাপ ক্যান? তাইতো জানতে চাচ্ছি।'
'বলব, এখন না। আগে বলাকায় গিয়ে সিনেমার টিকেট নিয়ে নেই, তারপর বলব। এখন নাম রিক্সা থেকে।'

বলে দুজন মেয়েদের টিকেটের লাইনে, টিকিট নিয়ে হলরুমে ডোকার সময় নীলা দেখে তার সামনের মেয়েটার পিছনে একটি ছেলে খোঁচা মেরে চলে যাচ্ছে, নীলা সাথে সাথে দৌড়ে গিয়ে ছেলেটিকে থামাল। সে ছেলেটিকে বলল,
'আপনি ওনাকে খোঁচা মারলেন কেন?'
'কোথায় মারছি, আপনি দেখেছেন? আর আপনার কি, আপনাকেতো মারি নাই। নাকি আপনাকে টাচ করি নাই বলে আপনার ভালো লাগছে না।'
আমি বললাম, 'চল নীলা, বাদ দে।'
'বাদ দিবো মানে, এসব লুইচ্ছাদের কি করে শায়েস্থা করতে হয় আমার জানা আছে।'
বলে একটা চড় বসিয়ে দিল ছেলেটার গালে। আসে পাশের লোকজন দেখে জড় হয়ে গেল আমাদের কাছে জানতে চাইল কি হয়েছে? আমরা বলতে  শুরু করতেই ছেলেটি আড়ালে গিয়ে বসে পড়লো। আমরা ঘটনাটি বলে আমাদের সিটে গিয়ে বসলাম।   
সিনেমা অর্ধেক শেষ করে আমরা দুজনে লাঞ্চ করতে মিডনাইট সানে গেলাম। ওখানে নীলাকে জিজ্ঞাসা করলাম-
'এবার বল তোর মন খারাপ কেন?'
'আমার সাথে তোর বোধহয় আজই শেষ দেখা।'
'মানে, শেষ দেখা মানে?'
'আমার ৭ তারিখ বিয়ে, ক্যাম্পাসে আর আসতে পারবো কিনা জানি না।'
'কি বলছিস এসব? কীভাবে কি হল?'
'জানি না, আমার বাবাকেতো চিনিস, আমি কিছুই জানি না, ছেলেকেও চিনি না। কোথায় বিয়ে তাও জানি না।'
'আমার অস্থির লাগছে, তুই জিজ্ঞেস করিসনি?'
'না, জিজ্ঞেস করিনি, কি লাভ! আর সব পুরুষ একই রকম, দেখি ভাগ্যে কি আছে, তবে সংসার করবো না এতটুকু জানি।'
'আমার ভাবতেই অবাক লাগছে, কিছুই বিশ্বাস হচ্ছে না।'  
'আমার বাবার মত বাবা হলে অবিশ্বাসের কিছু নেই রে চল উঠা যাক , নিউ মার্কেট যাব।'
'কেন, আমার যেতে ইচ্ছে করছে না।'
'মনে হচ্ছে তোর বিয়ে, চল, তোকে একটা গিফট দিব, আমার শেষ স্মৃতি হিসেবে রেখে দিবি।' 




আমি যেন সত্যিই শক্তি পাচ্ছি না। তারপরও গেলাম নিলার সাথে। দোকান ঘুরে ঘুরে সে আমাকে এক জোড়া কানের দুল কিনে দিল।
যাবার সময় সে বলে গেল, আজ রাত হয়ে যাবে বাসায় ফিরতে তাই বাবা বোধহয় আর ক্লাসে আসতে নাও দিতে পারে। তাছাড়া গ্রামে চলে যাবো দুদিন পর, সেখানেই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা হবে, তো আর বোধহয় দেখা হবে না, ভালো থাকিস। আর শুন, তোর ছেলে ঘুরানো কাজটা বন্ধ করিস, এটা উচিত না। বিদায় নিয়ে সে বাসে উঠে গেল, আমি অবাক হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম।  


৭ তারিখ রাত, নীলা বঁধু বেশে অরণ্যের রুমে, তার সবকিছু বিরক্ত লাগছে, চারিপাশে ফুল দিয়ে সাজানো, তার ইচ্ছে হচ্ছে এই সুন্দর ফুলগুলোকে একসাথে করে পা দিয়ে পিষে ফেলতে। কিছুক্ষণ পায়চারী করে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে সে ভাবতে থাকলো, মানুষের জীবন একান্তই নিজের তবুও তার উপর কেন নিজের নিয়ন্ত্রণ নেই? কেন অন্যমানুষ দ্বারা জীবন নিয়ন্ত্রিত হয়? তাহলে এ জীবন রেখে কি লাভ, তারচেয়ে মরে যাওয়া অনেক ভালো।
হঠাৎ দরজা লক করার শব্দ শুনে পিছনে তাকিয়ে দেখে অরণ্য, তখন তার আচমকা ভয়ংকর সব পুরনো স্মৃতি মনে পড়ে যায়, মক্তবে পড়ার সময় হুজুরের উরুতে বসিয়ে রাখার কথা, গৃহশিক্ষকের পা দিয়ে খোঁচা দেওয়ার কথা, কলেজের শিক্ষকের পিঠে হাত দিয়ে ব্রা পরেছি কিনা তা চেক করার কথা। তার মনে পড়ে যায় সবচেয়ে ভয়ংকর স্মৃতিটা, তার বাবার কাজের বুয়ার সাথে রান্না ঘরে শুয়ে থাকার দৃশ্যটা, ঘটনাটি মনে হলেই তার দম বন্ধ হয়ে যায়, পুরুষদের প্রতি ঘৃণা প্রকট আকার ধারণ করে, তার মনে হতে থাকে অরণ্য দরজাটা লাগিয়ে পুরুষ নামের ভয়ংকর জন্তুর মতো এখনই তার শরীর নিয়ে সে মেতে উঠবে, সে ভাবতেই শিউরে উঠে, হাত কাঁপতে থাকে আতঙ্কে। হঠাৎ শুনতে পায়
'আপনি দাঁড়িয়ে আছেন যে?'
নীলা কোন উত্তর না দিয়ে আবার জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে।
'হুম...আপনি দাঁড়িয়ে আছেন যে? অনেক রাত হয়েছে, ঘুমিয়ে পড়ুন, অনেকটা পথ জার্নি করে এসেছেন। ' 
নীলা, কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
'আপনি?'
'আমিও শুয়ে পরবো।'
'কোথায়?'
'আপনিই বলুন কোথায় শুবো?'
'শুনুন, আমি আপনাকে বিয়ে করেছি বাবার জন্য, আমাকে আপনি আজই ডিবোর্স দেন। আমি এখনই চলে যাবো।'
অরণ্য কিছুক্ষণ থমকে থেকে বলল,'এতো রাতে আজ কোথায় যাবেন? বাবার বাড়ী তো যেতে পারবেন না, একটু মাথা ঠাণ্ডা করে চিন্তা কারুন।'
'না, প্লিজ আমাকে মুক্তি দিন, এখুনি ব্যবস্থা করুন, আমি চলে যাবো।'
'দেখুন আপনি একটু বোঝার চেষ্ঠা করুন, তাৎক্ষনিক কিছু হয় না, ডিবোর্স আদালতের ব্যাপার, কীভাবে আপনাকে আজ দিব বলুন আর এখন আপনি যাবেন কোথায়? আমাকে আপনি বিশ্বাস করুন। আপনি যা চান তাই হবে। কিন্তু এখন শান্ত মাথায় বোঝার চেষ্ঠা করুন, এখন যদি আপনি চলে যান, বাড়ির সবাই জানবে, আপনার বাবা জানবে, আপনার বাবার আর আমার বাবার দীর্ঘ দিনের সম্পর্ক শেষ হয়ে যাবে, দুইটাদিন পরতো আমরা ঢাকায় চলে যাবো, তারপর আপনি যাই বলবেন তাই হবে। এখন প্লিজ্ শুয়ে পড়ুন, ঢাকায় যেয়ে আপনার কথা শুনবো, তারপর আপনি যা বলবেন তাই হবে।' 

নীলা চুপ করে আছে কিছু বলছে না।

অরণ্য আর কিছু না বলে চাদর আর বালিশ নিয়ে বারান্দায় চলে যায়, দরজার পাশে যেয়ে বলে আপনার মনে যদি ভয় কাজ করে ইচ্ছে করলে এই দরজাটা বন্ধ করে দিতে পারেন।

নীলা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ভাবে ছেলেদের বিশ্বাস নেই, তাই সে দরজাটা লাগিয়ে দিবে কিন্তু দরজাটা লাগানো কি ঠিক হবে কি হবে না ভাবতেই তার চোখে পড়ে টি টেবিলের ছুরিটার দিকে, সে সেটিকে নিয়ে খাটে এসে বসে থাকে কিছুক্ষণ, ক্লান্ত শরীরে কখন ঘুম এসে পড়ে সে টের পায় না। সকালে ঘুম থেকে উঠে আশেপাশের সবকিছু গুছানো, তা দেখে তার কিছুই মনে হয় না চুপ করে বসে থাকে বিছানায়, ভাবতে থাকে এ থেকে সে কখন মুক্তি পাবে?


নীলা আর অরণ্য বাসে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা করেছে, দুজনে পাশপাশি বসা কিন্তু কেউ কোন কথা বলছে না। নীলা বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে, অরণ্য একবার তাকাল তার দিকে, ক্ষানিকটা সময় পর অরণ্য নীলাকে বলল,
-   ঢাকা গিয়ে উঠবেন কোথায়?
-   এখনো ঠিক করিনি, এক বান্ধবী আছে তার মেসে উঠবো।
-   তাকে জানিয়েছেন?
-   না এখনো জানায়নি।
-   তাকে ফোন করে আগেই জানানো উচিত ছিল, যদি উনার বাসায় কোন ঝামেলা থাকে।
-   তা আপনাকে চিন্তা করতে হবে না, আমি দেখে নিবো।
আচ্ছা বলে অরণ্য চুপ হয়ে গেল।
ওদিকে নীলা আমাকে ফোন দিল, জিজ্ঞাসা করলো মেসে থাকতে পারবে কিনা?
বললাম দুইজন গেস্ট আছে দোস্ত, কিন্তু তুই এই সময়ে মেসে থাকার কথা বলছিস!! তোর না বিয়ে, কোথায় তুই? কি হয়েছে?’
নীলা, আচ্ছা ঠিক আছে বলে ফোনটা রেখে দিল। ওদিকে অরণ্য কিছুটা খেয়াল করছিল পরে সে জানতে চাইলো, কি হয়েছে?
নীলা কোন উত্তর দিল না।
অরণ্য কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার জানতে চাইলো, কোন সমস্যা কিনা।
নীলা ইতঃস্থত বলল,বান্ধবীর বাসায় জায়গা নেই, সমস্যা নেই আমি বাসা খুঁজে নিবো। 
-   প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে, বলছিলাম কি, বাসা পাওয়ার আগ পর্যন্ত যদি আমার বাসায় থাকতেন,যদি আমাকে বিশ্বাস করেন।  
নীলা ভাবতে থাকলো এই মুহূর্তে হাতে যে টাকা আছে তা দিয়ে ভালো বাসা পাওয়া যাবে না, একা সব জায়গায় গেলেও সবাই সেই একই সুযোগ লুটবে, তারচেয়ে বরং উনার সাথে আজ যাই, দেখা যাক কি হয়,  ভেবে সে তাকে বলল,
- আচ্ছা ঠিক আছে। আপনার বাসা কোথায়?
- ধানমন্ডি, ছোট্ট একটি ফ্ল্যাট-এ থাকি। আপনি চিন্তা করবেন না, থাকার মতো রুম আছে।
- না ঠিক আছে।
বলে নীলা মনে মনে বলতে লাগলো, লোকটাকে দেখেতো ভদ্র মনে হচ্ছে নাকি ভদ্র সাঝার ভান করছে, ভেবে সে জিজ্ঞাসা করলো,
-   আপনি আমাকে না দেখে কীভাবে বিয়ে করলেন, আশ্চর্য!!
-   আমি কোনদিন বাবার অবাধ্য হইনি তাই।
-   ও আচ্ছা।
-   চলে এসেছি প্রায়, চলুন নামার জন্য তৈরি হই।
কিছুক্ষণ পর, বাস স্টপেজ-এ এসে থামল। বাস থেকে নেমে অরণ্য একটি ট্যাক্সি কে ডাকল। দুজন ট্যাক্সিতে চড়ে প্রায় মধ্যরাতে অরণ্যের বাসায় পৌছালো। নীলা বাসায় ঢুকে দেখে বাসাটা বেশ বড়। অরণ্য নীলাকে ওয়াশরুমটা দেখিয়ে বলল, যান ফ্রেশ হয়ে নিন, আমি রেস্ট্রুরেন্ট থেকে খাবার নিয়ে আসছি। অরণ্য স্টার থেকে খাবার এনে দেখে নীলা ফ্রেশ হয়ে সোফায় বসে আছে। অরণ্য নীলা কে বলে, সরি দেড়ি হয়ে গেল। সে তারাতারি টেবিলে খাবারটা রেখে বলল নিন খেয়ে নিন আমি ফ্রেশ হয়ে পরে খেয়ে নিব। নীলা কিছু বলল না। অরণ্য আর কিছু না বলে ওয়াশরুমে চলে গেল। নীলা উঠে দাঁড়িয়ে চারিপাশটা দেখতে লাগলো, দেখতে পেল ঘরটা বেশ গুছানো, কিছুটা এগিয়ে সে বেলকনিতে যেয়ে বাহিরে অবলোকন করতে লাগলোকিছুক্ষণপর অরণ্য এসে কি ব্যপার আপনি দেখি কিছু খাননি, চলুন খেয়ে নিবেন। নীলা চুপ করে আছে, অরণ্য আবার চলুন বলে সে টেবিলের দিকে যেতে লাগলো। নীলাও এসে চেয়ারটায় বসলো, খেতে খেতে সে অরণ্য কে বলল,
-   আমি কাল চলে যাব।
-   যদি বাসা না পান?
-   না, পেয়ে যাবো
-   আচ্ছা, ঠিক আছে। এখন খেয়ে নেন, তারপর শুয়ে রেস্ট নেন। কাল সকালে খেয়ে চলে যাবেন।

নীলা চুপ করে রইলো। তাদের খাওয়া শেষ অরণ্য নীলাকে রুম দেখিয়ে চলে আসলো তার রুমে। 

.


নীলা ঘুম থেকে উঠে দেখে ওয়াশরুমে যেতে দেখে অরণ্য রান্না ঘরে রান্না করছে, কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সে ওয়াশরুমে চলে যায়। বের হয়ে দেখে অরণ্য টেবিলে খাবার সাঝাচ্ছে। অরণ্য নীলাকে দেখে বলে আপনি উঠেছেন, খাবার তৈরি, আমি অফিসে যাবো তাই একটু তারাতারি, আপনি যদি আরও পরে খান তাহলে পরে খেতে পারেন। নীলা কিছু না বলে খাবার টেবিলে গিয়ে বসলো, জিজ্ঞাসা করলো,

-   আপনি কখন বের হবেন?

-   এইতো সাড়ে আঁটটায়।
-   আমিও বের হয়ে যাবো, ক্যাম্পাসে যাবো, তারপর বাসা খুঁজবো।
-   কিছু যদি না মনে করেন, একটা প্রশ্ন করব।
-   আচ্ছা আপনার প্ল্যান কি? কি করবেন?
-   এখানে পড়াশুনা শেষ করে গবেষণা করতে বাইরে চলে যাবো।
-   কতদিন আছে, এইতো দুই সেমিস্টার। 
-   ভাল। বলছিলাম, বাসা না পেলে এখানে চলে আসলে ভালো হয় না? অন্য কাউকে ঝামেলায় ফেলা দরকার কি!!নীলা কিছু বলে না, চুপ করে থাকে। কিছুক্ষণপর ওরা বেড়িয়ে পড়ে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে অরণ্য একবার নীলাকে বলে পৌঁছে দিবে কিনা। নীলা বলে, না, দরকার নেই, আমি একাই যেতে পারবো। 


( তারপর নীলা মা-বাবা আসে, দুদিন অরণ্যের বাসায় থাকে।  পরে বান্ধবীদের কাছে টাকা ধার নিয়ে বাসা ভাড়া নেয়। বান্ধবীরা তাকে বুঝানোর চেষ্টা করে কিন্তু কিছুতেই শুনেনি। টিউশনি করে সে টাকা শোধ করে, লেখাপড়া শেষ করে , অরুণ সারের সাথে কিছু ঘটনা উল্লেখ করব এখানে)



নীলার গত সেমিস্টারের রেজাল্ট বেরিয়েছে, অরুণ স্যার, নীলাকে ডেকে বলল,
-অভিনন্দন নীলা, তুমি তোমার রেজাল্ট ধরে রেখেছো, তুমি আবারও ফার্স্ট হয়েছো। 
-ধন্যবাদ স্যার।
-তারপর, তোমার সামনের প্ল্যান কি?
-স্যার, আপনার কাছে থিসিস করতে চাচ্ছিলাম।
-হুম, নতুন একটা টপিক খুঁজছিলাম, দেখি চিন্তা করে, তোমাকে জানাব আমি। 
-ঠিক আছে স্যার।
বলে নীলা বেরিয়ে আসছিল।হঠাৎ স্যার নীলাকে ডেকে বলল,

-এই নীলা শুনো, আমার একটা প্রাক্তন ছাত্র আছে, তরুণ গবেষক। সে আমার কাছে একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট চেয়েছিল। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টের তেজষ্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণা করছে। তুমি বরং ওর সাথেই কাজ কারো। খুব মেধাবী একজন ছেলে, অক্সফোর্ড থেকে পিএইচডি করে এসেছে, এখন কাজ করছে বাংলাদেশ পরমাণু গবেষণা কেন্দ্রে। তোমাকে ছাড়া আর কাউকে দেখছি না ওর সাথে কাজ করার মত কেউ আছে।
- স্যার আপনার সাথে করলে ভালো হয় না স্যার,উনাকে আপনি অন্য কাউকে দেন।
-না, ও আমার খুব প্রিয় একজন ছাত্র, তোমার ভালোর জন্যই বলছি। আমি চাই তুমি ওর সাথেই থিসিসটা কমপ্লিট করো। 
-আচ্ছা ঠিক আছে স্যার।
- কাল এসো একবার, আমি ওকে বলে তোমাকে পাঠিয়ে দিবো ওর কাছে।
- ঠিক আছে স্যার, তাহলে আজ চলে যাই। 
- আচ্ছা, যাও।

নীলা ক্যাম্পাস থেকে সোঝা চলে আসলো টিউশনিতে। তার ভীতরে আজ স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ কাজ করছে।
পরদিন সে অরুণ স্যারের কাছে গেল, স্যার নীলাকে দেখে বলে, এসেছ নীলা? সে রাজী হয়েছে। উনি একটি খাম বাড়িয়ে দিয়ে বলে, এই নাও ঠিকানা।
নীলা হাত বাড়িয়ে খাম নিল, খামটি খুলে দেখে নাম দেখে, ডঃ সেলিমুর রাহমান অরণ্য, রিসার্চার, পরমাণু শক্তি কমিশন, শাহ্‌বাগ, ঢাকা। নীলা কিছুটা আশ্চর্য হল, ভাবতে থাকলো, এ কি ঐ উনি? আবার সেই ভাবছে, উনি এতবড় রিসার্চার হবে কিভাবে, অরণ্য নামতো কয়েকজনেরই হতে পারে।
স্যার বলল, এই নীলা, কি ভাবছো? তুমি এখনই চলে যাও।  
নীলা বলল, জ্বী স্যার, বলে নীলা বেড়িয়ে আসলো। গেইটের দারোয়ানকে বলল, ডঃ সেলিমুর সাহেবের সাথে দেখা করব।
দারোয়ান বলল, আপনি এখানে দাঁড়ান, আমি স্যারকে বলে আসছি।
কিছুক্ষণপর, দারোয়ান এসে বলল, স্যার আপনাকে যেতে বলেছে সাথে সে রুমটাও দেখিয়ে দিল।
নীলা, সোজা চলে গেল রুমের সামনে, গিয়ে দেখে রুমে কেউ নেই।
কিছুক্ষণপর পিয়ন চা নিয়ে এসে নীলাকে বলে, আপনি এসেছেন, স্যার আপনাকে বসতে বলেছে। স্যার একটু ল্যাবে কাজ করছে, আপনি বসুন, স্যার কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে।

পিছন থেকে নীলা শুনে, “আপনি এসেছেন, সরি আপনাকে অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখলাম
নীলা কথাটা শুনে পিছনে তাকিয়েই হতবাক, দেখে এ আর কেউ নয়, অরণ্য।
অরণ্য বলে, কেমন আছেন আপনি?
নীলার পক্ষ থেকে কোন উত্তর আসে না।
অরণ্য বলে, কেমন আছেন আপনি, কেমন চলছে দিনকাল?
নীলা এবার বলে, জ্বী ভালো। মনে মনে সে ভাবতে কত বড় একজন মানুষ, কিন্তু কি সহজ সরলভাবে জীবনযাপন করে, বুঝতেই পারিনি। একটিবার গর্ব করে আমাকে নিজের পরিচয়টুকু দেয়নি। 
অরণ্য বলে, অবাক হয়েছেন? আমি কিন্তু অরুণ স্যারের কাছ থেকে নাম শুনেই বুঝতে পেরেছিলাম আপনি।
নীলা কিছু বলে না।
চলুন ল্যাবটা দেখে আসি, বলে অরণ্য বেড়িয়ে গেল। 
নীলাও কিছু না বলে তার পিছনে পিছনে যেতে লাগলো।
অরণ্য একে একে সবকিছু পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে, আর নীলা খুব আশ্চর্য হচ্ছে।
কিছুক্ষণপর অরণ্য বলে, 
আমার বাড়িতে অনেক রেফেরেন্স বই আছে আগামীকাল নিয়ে আসবো, আপনি নিয়ে বাসায় একটু পড়াশুনা করবেন।
- আপনার কষ্ট করে আনা লাগবে না, আমিই আপনার বাসা থেকে নিয়ে আসবো।
- আচ্ছা ঠিক আছে। চলুন তাহলে আজ বেরিয়ে যাই। কাল থেকে শুরু করব কাজ। আশা রাখি চার মাসে শেষ করতে পারবো।
- চলুন।

নীলা বাসায় যেয়ে ভাবতে থাকে মনে মনে বলতে থাকে, ‘জীবনে অরুণ স্যার ছাড়া কোন পুরুষকে আমি বিশ্বাস করতে পারিনি। কেন জানি লোকটাকে ভালো মনে হচ্ছে, মনে মনে ভাবছে, তার মার কথাগুলো, বান্ধবীদের কথাগুলো। আসলেই কি সে ভুল করেছে।পরমুহূর্তেই ভাবে, আমি আমার লক্ষ্যে পৌছাবোই, শুধু শুধু অপ্রয়োজনীয় কথা ভাববার দরকার নেই।


নীলা পরদিন সকালেই অরণ্যের বাসায় যেয়ে কলিং বেল বাজাল, অরণ্য দরজা খুলতেই দেখে নীলা, সে বলে

-আসুন, ঘরে আসুন। রান্না করছিলাম।

-কাজের বুয়া রাখলেই পারেন।
-ওদের রান্না খেতে পারি না, আসলে লন্ডনে থেকে অভ্যাস হয়ে গেছে, এখন আর পরিশ্রম মনে হয় না। আপনার বইগুলো ওখানে রেখে দিয়েছি, আপনি ঐ গুলো দেখতে থাকুন আমি তৈরী হয়ে নেই। 
ও হ্যা, আপনি নাস্তা করেছেন
-হ্যা, আমি নাস্তা করেছি, আপনার তাড়াহুড়া করা লাগবে না, আপনি আপনার গতিতে চলুন আমি বরং বই গুলো খুলে দেখি।
-আচ্ছা ঠিক আছে।

অরণ্য, নাস্তা শেষ করে তৈরী হয়ে, দু'জন একসাথে রিক্সায় উঠলো। নীলা হুট করে জিজ্ঞেস করে

-আপনি গাড়ি কিনেন না কেন, এভাবে চলতে কষ্ট হয় না আপনার?

-না কষ্ট হয় না, ঢাকা শহরের ধূলোময় পরিবেশ আর জ্যামের সাথে গাড়ি মানায় না। বরং রিক্সাই ভালো, জ্যামে পরলে হেঁটে চলে যাই। অনেক টাইম বেঁচে যায়, আমার কাছে সময়টা অনেক বেশী ইম্পরট্যান্ট। তাছাড়া বাসাতো বেশী দূরে না। 
- তা ঠিক। তো আপনি অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করে দেশে কেন চলে আসলেন? এই শহরে আপনি কি আপনার মত কিছু করতে পারবেন?
- না, তা হয়ত পারবো না, ইচ্ছে করলে থেকে যেতে পারতাম কিন্তু বড্ড ভালোবেসে ফেলেছি আমার এই দেশটাকে। দেশের মানুষজন হয়ত আমাকে কিছু দিবে না  কিছু কিন্তু দেশটা তো আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে তাকে আমি ছেড়ে কিভাবে যাই, কিছুটা ঋণ শোধ না করতে পারলে জীবন আর সার্থক হলো কই।

নীলা কথাগুলো খুব মুগ্ধ হয়ে শুনছে। হঠাৎ সে শুনে, "এসে পড়েছি। এখন নামা যাক।" বলে অরণ্য নেমে পড়ল। নীলা নামার পর তারা সোজা ল্যাবের অভিমুখে। অরণ্য সব বুঝিয়ে দিচ্ছে নীলাও সব করে চলছে। 

নীলার কাজ দেখে অরণ্য খুবই মুদ্ধ দৃষ্টিতে নীলার দিকে তাকিয়ে আছে। নীলা তাকাতেই অরণ্য চোখ নামিয়ে নেয়।

এভাবে চলে যায় অনেকটাদিন। দু'মাসপর অরণ্য দেখে কাজ খুব দ্রুত মিলে যাচ্ছে। ভেবেছিল সে জটিলতা আসবে কাজে কিন্তু আসেনি। সে এ কৃতিত্ব নীলাকেই দিতে চায়। সে না থাকলে হয়ত এত দ্রুত এতটা এগোতে পারতো না।
ওদিকে নীলা ভাবতে থাকে উনার সাথে কাজ না করলে কতকিছু অজানা থেকে যেত। কত মেধাবী লোকটা। হঠাৎ ফোনের রিংটোনটা বাঁজতে থাকে, নীলা ফোনটা হাতে তুলেই দেখে অরণ্যের ফোন। ফোন রিসিভ করতেই শুনতে পায়,
-হ্যালো, কোথায় আপনি? আপনার সাথে জরুরি কথা ছিল।

-জ্বী, বাসায়। বলুন

-ফোনে না, আপনি মিড নাইট সানে চলে আসুন। লাঞ্চ করতে করতে বলি। 
-আচ্ছা, আমার আধা ঘন্টার মত লাগবে।
-আচ্ছা ঠিক আছে, আমি অপেক্ষা করছি।

নীলা রুমটা গুছিয়ে, তৈরী হয়ে মিডে গিয়ে দেখে অরণ্য বসে আছে কোনার টেবিলটায়। নীলা গিয়ে বলল-

-সরি ১০মিনিট দেড়ি হয়ে গেল।

-সমস্যা নাই, কি খাবেন বলেন। খেতে খেতে কথা বলি। 
-আপনিই অর্ডার করুণ না। 
-আপনি করুণ, যা ভালো তাই করুণ।
-নীলা, ওয়েটারকে ডেকে বলল, ভেজিটেবল, চিকেন আর চাইনিজের প্যাকেজটা দেকিয়ে বলল দুটো দিয়ে যান। এবার বলুন কি বলবেন। 
- জ্বি, আপনাকে আসলে ডেকেছিলাম, আগামীকাল বাবা-মা আসবে। কি করে আপনার কথা বলব বুঝতে পারছি না। বলছিলাম, আপনি যদি দুইটা দিন কষ্ট করে আমার বাসায় থাকতেন, খুব ভালো হতো। ডিবোর্সের প্রক্রিয়া প্রায় শেষ, কিছুদিনের মধ্যে কাগজ চলে আসবে। 
অরণ্যের মুখে বাসায় থাকার কথাগুলো শুনতে নীলার ভালোই লাগছিল, ডিবোর্সের কথাটা শুনতেই তার মনটা কেমন করে উঠলো।  সে অরন্যকে বলল,

- আচ্ছা, ঠিক আছে। 

বলে নীলা আর কথা বলল না। দু'জন খাওয়া শেষ করে বাড়ি চলে আসলো কিন্তু তাদের মধ্যে আর খুব বেশী কথা হলো না। 

পরদিন খুব সকালে নীলা অরন্যের বাসায় চলে গেল। গিয়ে দেখে অরণ্য মাত্র ঘুম থেকে উঠেছে। নীলা যেঁচে জিজ্ঞাসা করলো, রাত জেগেছেন বুঝি
-হুম, আজ রান্না করতে পারবো, বাহিরে খেতে হবে। আপনি নাস্তা করেছেন?
- না, কেন বাহিরে খাবেন। আজ রান্না করবো। বাজার সদাই আছেতো?
-না না, আপনি কষ্ট করবেন কেন, তারচেয়ে বাহিরে থেকে আনি।
-কেন আমার হাতের রান্না খেতে পারবেন না, যদিও আমি ভালো রান্না করি না।
-না না, কি বলেন, আপনি কষ্ট করবেন, তাই বলেছি।

নীলা আর কিছু না বলে, সোজা রান্না ঘরে চলে গেল। গিয়ে দেখে রান্না ঘরটাও বেশ ঘুছানো। মনে মনে সে ভাবে, এই লোকটা এত ঘুছানো, কেন আমি তাকে ছেড়ে দিচ্ছি। আবার বলে, উনিও একবারও আমাকে কিছু বলল না, উনি কি বলতে পারতো না, আমরা একসাথে থাকি। হয়ত আমাকে ভালো লাগেনি। ওদিকে অরণ্য ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে রান্না ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে নীলার রান্না করা দেখছে। হুট করে নীলা চোখ পড়ে, সে বলে

-কি দেখেন?

-দেখছি আপনাকে।
-আমাকে দেখার কি আছে?
-না, দেখছি আপনি ভালো রাধুনীও বটে।
-কিভাবে বুঝলেন, রান্নাই খেলেন না!
-রান্না করার ধরণ দেখলেই বুঝা যায় কে ভালো রাঁধতে পারে।
-তাই বুঝি? তবে আপনিও কিন্তু বেশ রাঁধতে পারেন। আপনার বোধহয় দেরি হয়ে যাচ্ছে। আপনি টেবিলে বসুন, আমি সব নিয়ে আসছি।

[অরন্য রান্নার প্রশংসা করেছে, তার বাবা-মা এসেছে, নীলা তার বাবা মাকে একবারে বউয়ের মত আপ্যায়ন করেছে]


[থিসিসের রিপোর্ট লেখা শেষ, অরন্য আর নীলা অরুণ স্যারকে দেখিয়েছে। অরুণ স্যার খুব প্রশংসা করেছে তাদের কাজকে। বড় একটা জার্নালে তাদের থিসিস পাবলিশড হয়েছে, ওদিকে নীলা গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করে বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে এপ্লাই করা শুরু করেছে অরন্য তাকে হেল্প করছে।
এক সকালে নীলা, তার ই-মেইল চেক করতে দেখে, ডঃ স্টেফেনসন, এমআইটি থেকে তাকে ইনভাইট করেছে তার অধীনে ফেলোশিপ করার জন্য। নীলা দেখেই খুশিতে লাফ দিয়ে উঠে, সাথে সাথে সে অরুন স্যারকে জানাল। অরুণ স্যার তাকে অভিনন্দন জানালো। ফোনটা রেখে সে অরণ্যের বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। গিয়ে দেখে অরণ্য খাচ্ছে, অরণ্য নীলাকে দেখে অবাক হয়, নীলা ই-মেইলটা তাকে দেখায়, অরণ্য খুব খুশি হয়।
নীরা যেদিন চলে যাবে, তার আগেরদিন অরণ্য নীলাকে বাসায় আসতে বলে, নীলা বাসায় আসে, কিন্তু অরন্যের আসতে দেরি হয়তখন নীলা এ সময়ে, অরণ্যে ব্যাক্তিগত লাইব্রেরীর সামনে যায়, তার চোখ পড়ে টেবিলে ডায়েরিটার উপর, ডায়েরি খুলতেই দেখে অরন্যের হাতের লেখা, সে পড়তে থাকে, তাকে নিয়ে অরণ্যের লেখা গুলো পড়তে, সে বুঝতে পারে তাকে অরন্য কতটা ভালোবাসে, ডায়েরিটা পড়ে সে রেখে দেয়। সে মনে মনে খুব আনন্দ পায়, এই মুহুর্ত অরন্য বাসায় আসে। কিছুক্ষণ পর, অরণ্য তাকে ডিবোর্স লেটারটা হাতে দেয়। নীলা লেটারটা দেখে খুব কষ্ট পায়, অভিমান করে সে তখনই বাসায় চলে যায়। বাসায় যেয়ে লেটারটাকে ছুড়ে ফেলে সে অনেক কান্না করতে থাকে। পরদিন সে এয়ারপোর্টে যাওয়ার লম্বা চিঠিতে বলে
"আপনি আমাকে ভালোবাসেন, একটিবার মুখে বলতেন বা নাই বলতেন কেন লেটারটি  দিয়েছেন? আমি আপনার ডায়েরিটা পড়েছি, কিন্তু আপনি আপনি লেটারটি হাতে দিয়ে সবকিছু নষ্ট করে দিয়েছেন। আমি খুব কষ্ট পেয়েছি, আমি চলে যাচ্ছি, ভালো থাকবেন। আমার চোখ দেখে বুঝতে পারেননি আমি আপনাকে ভালোবাসি, আসলে আপনি ডায়েরিতে মিথ্যা বলেছেন। আপনি মিথ্যুক, কাউকে আর আমি বিশ্বাস করি না।"]
অরণ্য, ই-মেইলটি পড়ে একাই হাসতে থাকে।
ওদিকে নীলা চলে যায় আমেরিকা, সে ডঃ স্টেফেনসনের সাথে দেখা করে। উনি নীলাকে একটি ইনভাইটেশন কার্ড দেয় একটি ওয়ার্কশপের। নীলা যোগ দেয় ওয়ার্কশপে, উপস্থাপক ঘোষণা করে প্রধান বক্তা ডঃ সেলিমুর রহমান সে তখন চমকে যায়। ভিতরে ভিতরে তার ভালো লাগে পরমুহুর্তে তার মনে হয়ে ডিবোর্সের কথা, অনুষ্ঠান শেষ করে, নীলা কিছুটা ইচ্ছে করে যখন চলে যাচ্ছিল, অরণ্য তার সামনে এসে দাঁড়ায়। সে দু'হাত বাড়িয়ে দেয় নীলার দিকে, নীলা আসে না তার দিকে। সে তখন নীলার দিকে ছুটে গিয়ে বলে

-আরে বোকা মেয়ে তুমি খুলে দেখেছিলে ঐ খামের ভিতর কি ছিল।

-কেন ডিবোর্স লেটার
-একবার খুলেই দেখতে।
-কি ছিল ওটায়?
-ওটায় ছিল, আজকের অনুষ্ঠানের লেটার। আমি মিথ্যা বলেছিলাম। তোমার ফ্লাইট ক্যানসেল করে আমরা দু'জনে একসাথে আসতাম পরের ফ্লাইটে। কিন্তু তুমি এমনভাবে চলে গেলে। 
-ইউ লায়ার। পরে তো অনেক সময় ছিল, আমাকে বলতে পারতে। 
-তাহলে যে আজকের সারপ্রাইজটা হতো না।

নীলা আবারও ইউ বলে অরণ্যের বুকের দিকে থাপ্পড় দিতে, অরণ্য তার হাতটিকে ধরে টান দিয়ে নীলাকে বুকে জড়িয়ে নেয়, একটু চাপ দিয়ে বলে অনেক ভালোবাসি তোমায়। নীলা অরণ্যের বুক মুখ গুজে থেকে বলে, মিথ্যুক। আর চারিপাশে নেমে আসে ঝুম বৃষ্টি। এ যেন শুকনো মরুর বুকে সুখের শ্রাবণ ঢল। 


x
x

Sunday, August 12, 2018

মৃত্যুর মিছিলে আরও একটি মৃত্যু

১.

দূর হতে আযানের ধ্বনি প্রতিটি অট্টালিকায় প্রতিধ্বনিত হয়ে মধুর সুরে ঘুমন্ত শরীফকে জাগালো। শরীফ চোখ মেলে তাকাতেই নতুন ভোরের মৃদু আলো জানালা দিয়ে তার চোখ স্পর্শ করছে।  ঘুম ঘুম চোখে মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখে ফযর নামাযের জামাতের সময় চলে যাচ্ছে। সে তারাতারি বিছানা থেকে উঠে ওযু করে মসজিতে চলে যায়নামায শেষ করে ঘণ্টাখানেক কোরআন পড়ে হোটেল থেকে নাস্তা কিনে বাসায় ফিরে।  গোসল সেরে নাস্তা খেয়ে আলনা থেকে শার্ট, প্যান্ট আর টাইটা নিয়ে তৈরি হতে থাকে অফিসে যাওয়ার জন্য।  টাইটা পরার সময়  সে মনে মনে বলে, ‘কেন যে এটা পড়তে বাধ্য করেছে?’ জুতোটা পরে দাঁড়িয়ে খেয়াল করে দেখে প্যান্টটা কণ্টার উপরে ঠিক আছে কিনা দেখে  অফিসে চলে যায়, সারাদিন অফিস করে ক্লান্ত হয়ে রাত আটটা-নয়টা বাজে বাসায় ফিরে।   

শরীফউল্লাহ শরীফফরিদপুরের এক কৃষক পরিবারের ছেলে। পরিবারে বড় ছেলে, ছোট বোনটি ক্লাস সিক্স এ পড়ে।  স্নাতকোত্তর শেষ করে এক বছর ধরে ঢাকার অদূরে একটি প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করছে।  দেশে যে চাকরির অবস্থাতাতে শরীফের মতো ছেলেদের চাকরি পাওয়া দুষ্কর ব্যাপারতারপরও দীর্ঘদিন পরিশ্রম আর মেধার গুনে এই চাকরিটি পেয়েছে। অফিসের নিকটে একটি ফ্ল্যাট বাসায় ভাড়া করে থাকে সে তার বাবা দেশে টুকিটাকি কৃষি কাজ করে। পূর্বে অন্যের জমি চাষ করত শরীফ চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকে আর করে না। তার বাবা-মার শহর ভালো লাগে নাতারা গ্রামে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেশরীফও জোর করে না তার সাথে থাকার জন্য।

শরীফের বাবা ওদিকে পাশের গ্রামের এক ধার্মিক পরিবারের মেয়ের সাথে ছেলের বিবাহ ঠিক করেছে। মেয়ের নাম কুলসুমমাদ্রাসায় কিছুদিন লেখাপড়া করেছে।  তার বাবা ফোন করে বলে দিয়েছে ছুটি নিয়ে বাসায় চলে আসতে।  সেও তার বাবার কথামতো আফিস থেকে ছুটি নিয়ে বাসায় চলে যায়।

সপ্তাহ খানেক পরবিয়ের ছুটি শেষে বউকে নিয়ে সে ভাড়া বাসায় উঠেছে।  বিয়ের পর তার দিনলিপিতে নতুন করে যুক্ত হয়েছে বাজারে যাওয়া,  মসজিদ থেকে ফিরার সময় সে এখন নিয়মিত বাজারে যায় তারপর বাসায় ফিরে।  কুলসুম তার জন্য রান্নাবান্না শেষ করে সকালের খাবার এবং হটপটে দুপুরের খাবার রেডি করে রাখে।  শরীফ চলে যাবার পর, কুলসুম অবসর সময়ে কোরআন-হাদিস পড়ে।তাছাড়া শরীফও কুলসুমকে এলেম শিক্ষা দেয়ধর্মীয় বিধি-নিষেধ সম্পর্কেপর্দা করার উপকারিতা সম্পর্কে বলে।    

এক সকালে শরীফ বাজার থেকে আসতে না আসতেই দরজায় নক করার শব্দ শুনতে পায়।  শরীফ দরজা খুলে দেখে, পিন্টুর ভাই মিন্টু ও তার বন্ধু রবিন।তাদেরকে দেখে শরীফ অনেকটা ভীত কারণ তারা পিন্টুর লোক। পিন্টু এলাকার মস্ত বড় ক্যাডারস্থানীয় এমপি তাকে পোষণ করে। ভীত হয়েই কুলসুমকে সে বলল, তাদের চা দিতে।  চা খেতে খেতে তারা বলল, “দাদা একটা কনসার্টের আয়োজন করতাছিতো পিন্টু ভাই আমনের কাছে আসতে কইলো।বুঝছেনইতো কিয়্যারলাইগ্যা আইছি!’’ সে তাদেরকে ১০০০ টাকা দিয়ে তারাতারি বিদায় করে।  টাকাটা নিয়ে মিন্টু ও রবিন বেরিয়ে আসলোরাস্তায় বের হয়েই মিন্টু রবিনকে বলল,
শরীফ ভাইয়ের বউডার কন্ঠটা শুনছস জোশ্ না। ’
‘হ্যা চরম টোনটা,কত আস্তে আস্তে কথা কইলো দেখলি।   কিন্তু তারেতো দেখতে পারলাম না, যেইভাবে পর্দা করছে চোখটা পর্যন্ত দেহা যায় না। ’
‘বোধয় ভালোই হইবোলম্বাও শরীফের মত’ বলতে বলতে তারা চলে গেল তাদের ক্লাবের দিকে।   

শরীফ শুক্রবারে আছরের নামায পড়ে কুলসুমকে নিয়ে বাড়ির পাশের রাস্তাটায় হাঁটতে বের হয়েছেহাঁটতে হাঁটতে তারা বাজারের পাশের রাস্তাটিতে যায়।  শরীফ আঙ্গুলটাকে উঁচু করে কুলসুমকে বলে, ঐ যে দোকান গুলো দেখা যাচ্ছে না ওটা বাজারওখান থেকেই আমি বাজার সদাই কিনি।  কুলসুম চোখ ফিরিয়ে দেখতে পেল অনেক পর্দাশীল ও সাধারণ মহিলা বাজারে এসে বাজার-সদাই কিনছে।  কুলসুম অবাক হয়ে শরীফকে বলছে,
দেখঅনেক মহিলারা বাজারে এসেছে। ’
‘হুমঅনেকেই আসে। ’  
‘তাদের কি স্বামী নেই যে তারা বাজারে আসে?
‘হুমআছে।  কিন্তু তাদের স্বামীদের সময় নেই বাজারে আসার। তুমি হয়তো জান নাবাংলাদেশের চাকরির কি অবস্থা! কিছু কিছু কোম্পানি লোকদের খাঁটিয়ে মারেতারা হয়তো রাত এগারটার আগে বাসায় ফিরতে পারে না এমনকি শুক্রবারেও অফিসে যাওয়া লাগে।  অর্থ উপার্জনের জন্য অফিসকে তারা ঘর-বাড়ি বানিয়ে ফেলে।  তুমি দেখো না আমিও মাঝে মাঝে এগারটায়-বারটায় বাসায় ফিরি। বেসরকারি চাকরিগুলো এমনই। তাই আমিও চাই টুকিটাকি দরকারি জিনিসগুলো তুমি বাজারে এসে নিয়ে যাও। ঐ যে ওখানে কর্ণারের দোকানটা দেখছ নাওটা আমার পরিচিত দোকান। ওখানে বলে দিবোযদি কিছুর প্রয়োজন হয় উনার কাছে আসলেই নিতে পারবে। ’  
‘হুমপারবো।  ওরা যদি নিতে পারে আমি পারবো না কেনভালই হলোতুমি মাঝে মাঝে টুকিটাকি দরকারি জিনিসগুলো আনতে ভুলে যাও ওগুলো ছাড়া এতদিন রান্না করতে হতো।  এখন আর তা হবে নালাগলে আমি নিয়ে যাব। ’  
‘তাহলে তো ভালোই হবে। 'চল এবারবাসায় ফিরি' বলে, শরীফ কুলসুমকে নিয়ে বাসায় ফিরে আসে।   

পরদিন শরীফ অফিস থেকে ফিরার সময় দেখে তার বাসার সামনের গলির রাস্তার মোড়টায় লোকজন ভীড় করে কি যেন আলোচনা করছে।  সে উৎসুক হয়ে ওখানে গিয়ে ঘটনার অনেকাংশ শুনল।  শুনে তার মনটা ব্যাথিত হয়ে উঠলোবাসায় ফিরে গোসল করে রাতে খাবারের সময় কুলসুমকে বলতে লাগলো-
জানো আজ রাস্তায় শুনলাম রহিমের মেয়েটা আছে নাও নাকি পাগলের মত আচরণ করছে। ’
‘কেনো কি হয়েছে হঠাৎ?
‘হাবু চাচা বলছেপিন্টুর বাবা গতকাল নাকি মেয়েটাকে দোকান থেকে চিপস আর কেক কিনে দিয়ে উনার সাথে বাসায় নিয়ে গিয়েছিল।  উনার বাসা থেকে ফিরার পর থেকে মেয়েটা এমন করছে।  কেউ কেউ বলছে পিন্টুর মা নাকি গত পনের দিন ধরে বাসায় নেইবাবার বাড়িতে গিয়েছে।  মনে হয়পিন্টুর বাবা কিছু একটা করেছে। কেউ তো পিন্টুর ভয়ে জোর গলায় কিছু বলতে পারছে না।  আবার এ সকল ঘটনা বেশী রটলে মেয়েটার অবস্থা কি হবে বুঝতেই পারছো। ’  
‘ছিঃ এইটুকু মেয়েকেবয়স কত হবে ৭ কি ৮! ভাবতেই অবাক লাগছেমানুষ এরকম পশু হয় কিভাবেআমার খুব খারাপ লাগছে বলে কেঁদে ফেলল কুলসুম।  তাদের কি কোন বিচার হবে নাবলে আবারও কাঁদতে লাগলো। ’
‘কে করবে বিচারতারা সব এক দলের লোক। সরকার তো তাদের হাতেই ক্ষমতা দিয়ে রেখেছে।  পুলিশও তাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নিবে না। ’  

২.

শরীফের অফিসে সকালে কাজ থাকে না বললেই চলে।  এই সময়টাতে অফিসের সকলে মিলে একটু গল্প গুজব করে।  শরীফ খুব একটা গল্পে শামিল হয় না।  কাজ গুলো গুছিয়ে রাখে এই সময়েমাঝে মাঝে দু'একটা কথা বলে ওদের সাথে যুক্ত হয়।  এক সকালে আরিফ পত্রিকায় হাত দিয়ে বলতে লাগলো-
‘আহারে! দেশে আর কোথাও নিরাপত্তা নেইক্যান্টনমেন্টেও মেয়েটা ধর্ষিত হলোগরীব ঘরের মেয়ে টিউশনি করে ফিরছিল’ 
গরীবুল্লাহ সাহেব বলল, ‘ফেসবুকে দেখলাম মেয়েটা নাকি মঞ্চে অভিনয়গান-বাজনাও করত। 
মোহম্মদ আলী কথা টেনে বলল, ‘ঠিকই আছে এই ধরণের মেয়েদের বেশী করে ধর্ষণ করা উচিত। ধর্ম-কর্ম না করে গান-বাজনা করেপর্দাতো করেই নাসব দেখিয়ে বেড়াবে আর পুলারা ধর্ষণ করবে না তো কি করবে ? ’
গরীবুল্লাহ বলল, ‘আলী সাহেব একদম ঠিক কথা বলেছেন। ’ 
আমি কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘এটা আপনি কি ধরণের কথা বললেন, আলী সাহেবএমন যুক্তি দাঁড় করালেন যে চোর চুরি করেছে তাই দোষটা চোরের নয়ভূক্তভোগীর।  পোশাকের জন্য নারী কিভাবে ধর্ষিত হয় বলেন দেখি।  এই যে কিছুদিন আগে পত্রিকায় পড়লাম সাত বছরের মেয়েটা যে ধর্ষিত হলোকেন হলোপশ্চিমা বিশ্বের মেয়েরা শুধু টপ পরে ঘুরে বেড়ায়তাহলে তাদের আরও বেশি ধর্ষণ হওয়ার কথা ’ 
আলী বলে, ‘দূর মিয়া আপনি দেখি কিছুই জানেন নাপরিসংখ্যান হাতিয়ে দেখুনবছরে সবচেয়ে বেশী ধর্ষণ হয় আমেরিকাতে।  আর দেখুন আরব দেশ গুলোতে কোন খবরই পাওয়া যায় না ’
‘হ্যাআমি সত্যিই জানি নারেফারেন্স দিন পরিসংখ্যানেরদেখি কোথায়?’ 
‘রেফারেন্স কি আমি মুখস্থ করে রেখেছি নাকি!’
‘আর উদাহরণ দিলে শুধু আমেরিকার দেন কেনআমেরিকা কি একমাত্র দেশ আর কোন দেশ নেই। সুইডেননরওয়েসুইজারল্যান্ডজাপাননিউজিল্যান্ড এসব দেশের উদাহরণ দেন।  জানেনএ সকল দেশে আপনার-আমার দেশের মেয়েরা রাতের ১০-১১টায় সাইকেল চালিয়ে অফিস থেকে নির্ভয়ে বাসায় ফেরে।  আর আপনার আরব দেশের কথা কি বলবওরাতো এক কাজের মেয়েকে বাবায় একদিন তো ছেলে একদিনদাসী বলে কথা।  মেয়েদের তো ওদের দেশে কোন মূল্যই নেইধর্ষণ করা তো কোন অপরাধ নাতো আবার ধর্ষণের খবর আসবে কোথা থেকে। দিনশেষে তেল বিক্রি করে বেইলি ড্যান্সের পার্টিতে টাকা উড়ায়আর তো কোন কাজ নেই তাদের। ’
আলীর চেহারায় উত্তেজনার ছাপমুখে কিছু বলতে পারছে না।  গরীবুল্লাহ সাহেব বিচলিত হয়ে চুপ হয়ে আছে।
আমি বললাম, ‘আপনার কি মেয়ে দেখলেই উত্তেজনা সৃষ্টি হয়ে যায় নাকিরাস্তায় পাগলীদের দেখলে তো হওয়ার কথাতারাতো উলঙ্গ হয়ে হাঁটে কিন্তু তাদের দিকে আপনারা ফিরেও তাকান না।  তাতে কি প্রমাণ হয় না এগুলো আপনাদের দৃষ্টিভঙ্গির সমস্যা?
আলী খুব রাগান্বিত হয়ে আমার টেবিলে জোরে এক থাপ্পর দিলপারলে এখনই আমাকে পিটাবে!!
হাসতে হাসতে বললাম, ‘টেবিলে থাপ্পর দিয়ে লাভ নেই যুক্তিতে আসুন। সেটাতো পারবেন নাপারবেন শুধু ধর্ষকদের পরোক্ষভাবে সাপোর্ট দিতে। দেখুন পৃথিবীর ইতিহাস ঘেঁটে অপরাধীধর্ষক যুগ যুগ ধরে ছিলথাকবে। কিন্তু তাদেরকে ধমিয়ে রাখতে হবে কঠোর আইন দ্বারা।  পর্দা দিয়ে ওদের দমন করা যাবে না। ’
‘আপনিতো ইহুদি-নাসারাদের দালাল দেখছিআপনার সাথে কি যুক্তি-তর্ক করব ’
‘আপনাদেরতো এই একটাই বুলি।  কোন কিছু করার ক্ষমতা নেইপারেন সব কিছুর শেষে এই একটি কথা টেনে আনতে। রেডিও আবিষ্কারের পর বলেছেন। তারপর টিভিমোবাইলইন্টাররেটফেসবুকের সময়ও বলেছেন এগুলো ইহুদি-নাসারাদের তৈরী এগুলো ব্যবহার করা হারামএখনতো এ সবই আপনারা ব্যবহার করছেন।করছেন কি পুরো দখল করে রেখেছেন।আপনাদের মত লোক অনেক দেখেছিমোবাইলের গ্যালারীতে একসাথে পর্ণ ভিডিও আর ওয়াজ রাখেনএকা থাকলে পর্ণ আর সবার সামনে ওয়াজ। আবার দেখি বউকে রেখে মাসে একবার হলেও ব্রোথেলে যান আর মুখে শুনান ধর্মের কথা। আপনারা বড্ড অভিনয় করতে পারেন ’
আলি এবার প্রচন্ড উত্তেজিত হয়ে ঐ নাস্তিকের বাচ্চা বলে প্রায় হাত তুলে ফেলেছিলশরীফ এসে তাকে  শান্ত করল। সে বলল, “থামুন এবারঘটনাকে আর বাড়াবেন না’’  কিছুক্ষণ পর শরীফ বলল, ‘আলি সাহেব আপনি যতই বলুনধর্ষক একজন অপরাধী তার শাস্তি হওয়া উচিত। নাহলে এই অপরাধের মাত্রা বেড়ে যাবে। ’
আলি জিম ধরে বসে রইলোকিছু বলল না।  ম্যানেজার সাহেব অফিসে আসলোসবাই কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।
বাড়িতে এসে শরীফ খাওয়ার সময় কুলসুমকে অফিসের ঘটনাগুলো বলল। কুলসুম বলল, “মেয়েদের পর্দা করা অবশ্যই প্রয়োজনইসলামের বিধান অবশ্যই পালনীয়। তাই বলে ধর্ষণের প্রধান কারণ পর্দা নয়এগুলো বিকৃতরুচির পুরুষপশুর চেয়ে অধমদের কাজ।  তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত। ’’

৩.

শরীফ প্রায়ই টুকিটাকি জিনিস আনতে ভুলে যায়আগে তার দ্বিতীয়বার যাওয়া লাগতোএখন কুলসুমই আনে বাজার থেকে। একদিন কুলসুম বাজার থেকে আসছিলপিন্টু আর পিন্টুর দল তার ক্লাবের সামনে আড্ডা মারছে।  কুলসুমকে দেখার পর পিন্টুমিন্টুকে জিজ্ঞাসা করলো-
‘এইডা ক্যাডা রে?
‘দাদা ঐ বাড়িতে ভাড়া থাকে না শরীফহের বউ ’
‘লম্বা-চূড়া তো ভালোইবোরকা ছাড়া দেখছসনি কহনো?’
‘নাদাদা।  একদিন বাসায় গেছিলাম তহনও দেহিনাইবাসায়ও পর্দা কইরা থাহে।  তয়কন্ঠ হুনছিলামখুব আস্তে সুন্দর কইরা কথা কয় ’
‘তাইলে তো মালডা ভালো হইবোআর পরহেজগার মাইয়্যারা বেশী সুন্দর হয়।  একদিন হের বাসায় যামুনে মনে কইরা দিস তো ’
‘আইচ্ছা দাদা ’
কুলসুম তাদের পাশ কাটিয়ে বাসায় চলে আসলো।  সে আসার সময় কিছুটা খেয়াল করেছিল ছেলে গুলো তাকে নিয়ে আলোচনা করছে।  শরীফ আসার পর ঘটনাটি বলল।  
শরীফ বলল, ‘থাক্ তোমাকে আর বাজারে যাওয়া লাগবে নাআমি সব নিয়ে আসব

কিছুদিন পর শরীফের সাথে পিন্টুর দেখা।  পিন্টু শরীফকে দেখে বলল,
‘কি শরীফ ভাই কেমন আছেনআছেন তো ভালোই। ভাবীরে নিয়া আসছেনভাবীর হাতে একদিন চা খাওয়ার দাওয়াত দিলেন নাএইডা কেমন কথা!’
আচ্ছা যাবেন একদিনবলে শরীফ চলে আসলো।
পিছন থেকে শরীফ শুনতে পেল, ‘আইচ্ছা চা খাইতে আইতাছি একদিনরেডি থাইককেন চোখে মুখে চিন্তার ছাপ নিয়ে শরীফ বাসায় আসলো। কুলসুমের চোখে তা ধরা পড়লখাবারের সময় তাকে সে জিজ্ঞাসা করল,
কি হয়েছেকিসের চিন্তা করছো?’  
‘পিন্টুর সাথে দেখা হয়েছিল রাস্তায়।  সে নাকি বাড়িতে চা খেতে আসবেকিন্তু কেন বুঝতে পারছি না। কারণ ছাড়া তার তো আসার কথা নয়। ’ একটু চুপ থেকে আবার বলল, ‘বাসাটা বদলে ফেলা প্রয়োজনএখানে আর থাকা যাবে না। ’
তুমি যা ভালো মনে কর’ বলে কুমসুমটেবিলের প্লেটগুলো হাতে নিয়ে রান্না ঘরের দিকে ছুটে গেল। ওদিকে শরীফ কিছুক্ষণ চেয়ারটায় বসে রইলো

দুইদিন না যেতেই পিন্টু হাজির।  শরীফ দরজা খোলা মাত্রই পিন্টু –
কি শরীফ ভাই আছেন কেমনভাবীর হাতে চা খাওয়ার জন্য আইয়্যা পড়ছি।  ঘরে বসাইবেন না?
‘হুম আসুনবসুন’ বলে শরীফ কুলসুমকে বলে আসলো চা করার জন্য।
‘আরে ভাই আপনি এত ছুটাছুটি করতাছেন ক্যানন এখানেদু'একটা কথা কই। ’
‘হুমবলেন। ’  
‘অনেক দিন ধইরা এলাকায় আছেন রাজনীতি করেন না ক্যান? আপনার মত লোক আমাদের লাগেশিক্ষিত মানুষ আবার আল্লা-বিল্লাহও করেন। আপনারে এলাকার মানুষ ভালোই জানে।  আপনি আইলে আমাদের দলের সুনাম বাড়বেযোগ দেন আমাদের লগে। ’
‘চাকরি করে এগুলো করার সময় কোথায়তাছাড়া আমি এ এলাকার মানুষ না আর আমার এগুলো ভালো লাগে না। ’
‘হু বুঝলামতো একদিন ক্লাবে তো আইতে পারেন। ’
ওদিকে শরীফ কে ডাকল চা নেওয়ার জন্য।  শরীফ চা নিয়ে পিন্টুকে দিল।  
পিন্টু চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, ‘আহ্অমায়িক চাজীবনেও এমন চা খাই নাই।  ভাবী বানাইছে নাকই ভাবি কইধন্যবাদটা সামনাসামনি না দিলে অয় না। ’
‘ভিতরে কাজ করছে আমি বলবো আপনি প্রশংসা করেছেন। ’
কি চা খাইলাম রে’ বলে চায়ের শেষ চুমুকটা দিয়েই পিন্টু উঠে দাঁড়িয়ে আবার বলতে লাগলো আমার আবার একটু ফিল্ডে যাইতে হইবোআপনি একদিন যাইয়েন ক্লাবে’’
দেখি সময় পেলে যাওয়ার চেষ্টা করবো’
ভাবি নির্ঘাত অনেক সুন্দরীএত সুন্দর চা সুন্দর মানুষ ছাড়া বানাইতে পারে না’ বলে পিন্টু বের হয়ে গেল।  
শরীফ রুমের ভিতর থেকে হতবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলোতারপর দরজাটা লাগিয়ে রুমে চলে আসলো।  

৪.

শরীফ অফিস থেকে ফেরার সময় নতুন বাসা খোঁজ করে বাসায় ফিরে।  সেদিনের পর থেকে শরীফের মুখে দুঃশ্চিন্তার ছাপ।  নতুন একটা বাসায় না উঠা পর্যন্ত তার শান্তি আসবে না।  একদিন রাতে খাবারের সময় কুলসুম কিছু একটা বলতে চেয়ে থেমে গেল।  শরীফ বললকিছু বলবে?’ 
কুলসুমের চোখে-মুখে লজ্জামুখ দিয়ে কোন কথা বের হচ্ছে না।  কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে তাৎক্ষনিক বলে ফেলল, ‘আল্লাহর রহমতে তুমি বাবা হতে চলেছো’। 
শরীফ কথাটা শুনে কি বলবে বুঝতে পারছে নাসে কুলসুমের দিকে তাকিয়ে আছে আর কুলসুম লজ্জায় নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। সমস্ত দুঃশ্চিন্তাগুলো শরীফের কাছ থেকে যেন ধুয়ে-মুছে গেলভিতরে কেমন যেন একটা আনন্দ বয়ে যাচ্ছেঘুমানোর আগে শরীফ দু'রাকাত নফল নামায পড়ে আল্লাহ্র কাছে শুকরিয়া আদায় করল। পরদিন হাসিখুশি হয়েই অফিসে গেল। কুলসুম শরীফের দিকে তাকিয়ে স্বস্তিবোধ করছেপিন্টু আসার পর থেকে কেমন যেন হয়ে গিয়েছিল। আজ সে আগের রূপটা দেখতে পেলমনে মনে বলতে লাগল, ‘আল্লাহ্ যেন আমাদের সবসময় এমনই রাখে’  

রান্না করতে গিয়ে কুলসুম ভাবলো আজ ভালো কিছু রান্না করবে।  ফ্রিজ থেকে মাংসের প্যাকেটটা নামিয়ে পানিতে ভিজিয়ে রাখল।  রান্নার সবকিছু গুছাতে গিয়ে দেখতে পেল মাংসের মশলা নেই।  একবার ভাবলো মশলা ছাড়াই রান্না করবে আরেকবার ভাবলো রান্নার মজাটা নষ্ট হয়ে যাবে। কিছুক্ষণ ভেবে শরীফকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করল মশলা আনতে বাজারে যাবে কিনাশরীফ অনুমতি দিল।  কুলসুম কিছু টাকা নিয়ে বাজারের দিকে বের হয়ে গেলদ্রুত হেঁটে যাওয়ায় রাস্তায় যে লোকজন নেই চোখে পড়ল না। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় রবিন দেখেছিল কুলসুম বেরিয়েছে।  রবিন পিন্টুকে গিয়ে খবরটা দিল।  পিন্টু খবর শুনে সাথে সাথে ক্লাবের সামনে রাস্তায় দলবল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কুলসুম বাজার থেকে ফিরছেএগুচ্ছে বাসার দিকে।  কিছুদূর আসার পর লক্ষ্য করলোরাস্তাটা আজ বেশ নির্জন।  তার মনে কেমন একটা ভয় ঢুকে গেল। সে যতদিন বাজারে গিয়েছে এতটা নির্জন কখনো দেখেনি। আসতে আসতে যখন ক্লাবের সামনে আসলোদেখলো পিন্টু দাঁড়িয়ে আছে তার দলবল নিয়ে। সে তাদেরকে দেখে হাঁটার গতি আরও দ্রুত করলো। সামনে আসার পর পিন্টু জিজ্ঞাসা করলো,- 
ভাবি কেমন আছেন?’  
কুলসুম কিছু বলল নাসে এগিয়ে যেত চাইলো কিন্তু পিন্টু গিয়ে পথটা রোধ করে বলতে লাগল-
‘অনেকদিন ধইরা আপনেরে দেখার স্বাদ জাগছিল। আজ আপনেরে সামনে পাইছিসে স্বাদটা পূরণ করতে চাই ভা.......বী। 
‘আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে পথটা ছাড়ুন দয়া করে। 
‘আপনার চেহেরাডা দেখাইলে ছাইড়া দিমু। নাইলে আমরাই আপনেরে দেখতে নিয়া যামু। ’ 
‘কি বলছেন আপনিদয়া করে অসভ্যবতা করবেন না। ’  
আমরা তো যথেষ্ট সভ্য আছি বলে’ পিন্টু কুলসুমের হাতটা ধরে ক্লাবের দিকে টান দিলতার সঙ্গীরা মুখ চেঁপে ধরে তাকে সাহায্য করল। কুলসুমকে নিয়ে বন্দী করল ক্লাবের একবারে কোনার ঘরটায়।  পিন্টু ঢুকেই দরজাটা বন্ধ করে দিল।  কুলসুম ওদিকে চিৎকার করে বলছে, ‘দয়া করে এ কাজ করবেন না আমার পেটের দু'মাসের সন্তানটা’, বলে হু হু করে কাঁদতে শুরু করল।  পিন্টু উচ্চস্বরে, ‘এইডাইতো ঠিক সময়’ বলে কুলসুমের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।  
কিছুক্ষণ পর পিন্টু বাইরে এসে তার দলবলকে বলল, 'কেডা কেডা যাবি রেযা একটা একটা কইরাতয় মারিস না।'
ওদিকে কুলসুম প্রায় অচেতনএকটার পর একটা ঝাঁপিয়ে পড়ছে কুলসুমের অচেতন দেহের উপর। কুলসুমের দেহ নিঃশ্চুপ হয়ে গেছেশরীরের প্রতিটি কোষে ছড়িয়ে পড়া ধ্বংসাত্মক জীবাণুগুলো রক্তবীজের মত বংশবৃদ্ধি করে চলছে তার দেহের ভিতরএকটি সময় কুলসুমের দেহের প্রতিটি কোষ নিজেদের সংবরণ করে গুটিয়ে নিয়েছে কেউ তখনও টের পায়নি।

বিকেলের দিকে শরীফ একবার ফোন দিয়ে দেখলফোন বন্ধ আছে। ঘন্টাখানেক পর আবারও ফোন দিয়ে দেখল যে ফোন বন্ধ।  সে আর তখন থাকতে পারল নাবসকে বলে অফিস থেকে সরাসরি বাসায় আসলোএসে দেখল বাসা তালা দেওয়া। শরীফ কিছুই বুঝতে পারছে না।কি করবে সে খুঁজে পাচ্ছে না, আমাকে ফোন দিয়ে সব ঘটনা বলল। আমি তাৎক্ষণিক ছুটে আসলামশরীফকে নিয়ে এ বাড়িও বাড়ি গিয়ে খোঁজ করতে লাগলাম। রাত নটা বাজেশরীফ কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।  শরীফের মনে ভয় কাজ করছিল পিন্টুকে নিয়ে আমাকে সে বিষয়ে ইঙ্গিত করল। 
বললাম, ‘চলেন থানায় জিডি করে আসি’
‘কিভাবে করবো সন্দেহ করেতাছাড়া পিন্টুর বিরূদ্ধে থানায় মামলা নিবে না।
‘তাহলে হারিয়ে যাওয়া নিয়ে মামলা করব’ বলে শরীফকে থানায় নিয়ে গেলাম। শরীফ থানার ওসি সাহেবকে সবকিছু বলল।  
ওসি বলল , “দেখেন কোথাও গেছে হয়ত
শরীফ বলল, ‘ওর কোথাও যাওয়ার কথা নয়’
ওসি হেসে বলল, ‘এরকম কত দেখেছি পরে দেখি আরেক স্বামীর হাত ধরে হাজির।  আপনার এ কেইস নাকি’?
উত্তেজিত হয়ে বললাম, ‘আপনি মামলা নিবেন না?’   
ওসি বলল, ‘না’
পরিচিত এক ডিআইজিকে ফোন না দিতেই ওসি সাহেব বলে উঠলো ‘আচ্ছা আমি মামলাটা নিচ্ছি’  

পরদিন সকালে শরীফ বেড়িয়েছে, উদাস ভাবে হাঁটছে।  হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ তার চোখ পড়ল ময়লার স্তুপের কাছে পড়ে থাকা কালো কাপড়টির উপর। তার কেন যেন মনে হচ্ছিল এটা কোন বোরকা। সে দৌড়ে গেল ওখানেগিয়ে তুলে নিল কাপড়টিতুলে নিয়েই সে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে হু হু করে কান্না শুরু করলো। কিছুক্ষণ পর সে  আমাকে ফোন দিয়ে জানালো,তাৎক্ষনিকভাবে আমি পুলিশকে জানালামপুলিশ এসে বোরকাটি নিয়ে পর্যালোচনা করতে লাগল।  বোরকাটির একটি বুতামও নেইকিছু অংশ ছেঁড়া। পুলিশ ধারণা করলযদি মার্ডার হয়ে থাকে তাহলে আশেপাশে হয়ত কোন চিহ্ন পাওয়া যাবেতারা পাশের নালাড্রেন গুলোর চারিপাশটা অনুসন্ধান করতে লাগলো কিন্তু কোনকিছুর চিহ্ন পাওয়া গেল না। পরদিন পুলিশ এসে বুলড্রেজার দিয়ে ময়লার স্তুপে খোঁজ করতে লাগল কিন্তু কিছু পাওয়া গেল না।  

এদিকে শরীফ একেবারে নিঃস্তব্ধখাওয়া-দাওয়া একদম ছেঁড়ে দিয়েছে। শরীফের আত্মীয়-স্বজন এখন তার বাসায়। আমি যাওয়ার পথে শরীফের বাসায় থাকি কিছুক্ষণ। শরীফ তার ঘরে দরজা লাগিয়ে একা একা বসে থাকে। মানসিক শক্তি আসলে নামাযে দাঁড়িয়ে যায় আর দুআ করতে থাকে কুলসুমকে যেন জীবিত পাওয়া যায়। হঠাৎ পুলিশের ফোন আসেফোন রিসিভ করতেই শুনতে পায় বাজারের পাশে ব্রীজটার কাছে আসতে।  ফোনটা রেখে সে দৌড়ে সেখানে যায়গিয়ে দেখে লোকজন ওখানে ভীড় করে আছে।  সে ভীড় ঠেলে ভিতরটায় প্রবেশ করেই দেখতে পায় পুলিশ বস্তার ভিতর থেকে একটা নারীর লাশ বের করছে। সে দৌড়ে লাশের কাছে গিয়ে লাশটি উল্টিয়ে চিরচেনা প্রিয়তমার চেহেরা দেখেই স্তম্ভিত হয়ে যায়আকাশের দিকে তাকিয়ে সে হু হু করে কাঁদতে থাকে, ঐ দুরের আকাশটা তার দিকে ভেঙ্গে পরেসূর্যটা যেন প্রচণ্ড বেগে তার দিকে ধেয়ে আসছেএকটি সময় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে।

শরীফ জেগে ওঠে দেখে  আমাকে, জিজ্ঞাসা করে, ‘কুলসুম কোথায়’?
পুলিশ ময়না তদন্তের জন্য নিয়ে গেছে’
কান্না বিজরিত কন্ঠে, ‘কেন দিয়েছেন ওকেতারা কিছুটি বের করতে পারবে নাঅনেক কষ্ট দিবে আমার কুলসুমকে’ বলে কান্না করা শুরু করে দেয়সে।  
আমি তার কাঁধে ধরে কিছুক্ষণ বসে থাকি।  
পরদিন জানা যায় ময়নাতদন্তে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গিয়েছে। খবরটা শুনার পর শরীফের চোখে যেন ভীষণ অন্ধকার নেমে আসেঘূর্ণিঝড় বয়ে যায় তার শরীরের ভীতর দিয়েপৃ্থিবীর সমস্ত কিছু তার মাথার সামনে ঝড়ের বেগে ঘুরতে থাকে।   

শরীফ কারও সাথে কোন কথা বলে নারুমে একা চুপচাপ বসে থাকে। সন্ধ্যায় আমি আসার পর শরীফ আমাকে দেখে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগে "কি অপরাধ ছিল কুলসুমেরকি অপরাধ ছিল আমাদের সন্তানের, তারা কেন আমাদের সন্তানকে পৃথিবীর মুখ দেখতে দিল না, কুলসুম কেন মা হওয়ার আনন্দ পেল না, সেতো পর্দা ছাড়া কখনো বের হয়নি...তবে কেন তাকে ঐ পশুগুলো ছাড়ল না” বলে কান্না শুরু করে। আমি শরীফকে সান্ত্বনা দেয়ার কোন ভাষা খুঁজে পেলাম না। শরীফকে একা রেখে কিছুক্ষণ পর অামি বেরিয়ে আসিরাস্তার ওপাশের দোকানটা থেকে একটি সিগারেট ধঁরিয়ে উদাসীন ভাবে আকাশের দিকে হাঁটতে থাকি আর মনের মধ্যে বাজতে থাকে শরীফের কথা গুলো, হাতের সিগারেট টান দিতেই লবণের স্বাদ লাগলো বুজতে বাকি রইলো না চোখের পানি বেঁয়ে ঠোঁট ভিজে মুখে ঢুকেছে , হঠাৎ অজান্তেই হাসি দিয়ে বলতে লাগলাম,    

“হায়রে আমার দেশ, তোমার কত সন্তানদের এভাবে আর চলে যেতে হবে? এই মৃত্যুর মিছিলে আর কতজন শামিল হলে, তোমার কুলাঙ্গার সন্তানরা ধর্ষকের বিপক্ষে দাঁড়াবে?’’



০৩-০৪-২০১৮

স্বপ্নগুলো

আজ মুখোর ঝড়ের দিনে আমার চোখের স্বপ্নগুলো দূর আকাশ হতে ঝড়ে পড়ে বৃষ্টির সাথে পত্র-পল্লবে নেঁচে বেড়ায়, গেয়ে যায় নতুন শাখার সুরের তালে, মিশে যায়...